মঙ্গলবার, ২৮ Jul ২০২৬, ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ সংবাদ :
বরিশালে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় ৪ জন আটক, শোরুম থেকে উদ্ধার ২ চোরাই বাইক নলছিটিতে ক্ষমতার পালাবদলেও বদলায়নি যুবলীগ নেতা সোহাগের প্রভাব উন্নয়নের নামে ঝালকাঠি পৌরসভায় হরিলুটের অভিযোগ বিসিসির প্রধান প্রকৌশলী হুমায়ুন কবিরকে নিয়ে অপপ্রচার ও প্রপাগান্ডা হাজী মোহাম্মদ মহসিন হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ী কমিটি গঠন, সভাপতি সেলিম ও সম্পাদক খোকন নির্বাচিত বরিশালে প্রাথমিকে বৃত্তি পেল মেধাবী শিক্ষার্থী কাজী সালমান বরিশালে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকদের পাশে ছাত্রদল নেতার মানবিক উদ্যোগ বরিশাল জেলা আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির ২৫ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন বাকেরগঞ্জে বিএনপি নেতা ফরিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বরিশালে পুলিশের অভিযানে সাবেক শ্রমিকলীগ নেতা
উন্নয়নের নামে ঝালকাঠি পৌরসভায় হরিলুটের অভিযোগ

উন্নয়নের নামে ঝালকাঠি পৌরসভায় হরিলুটের অভিযোগ

তানজিমুন রিশাদ:: ঝালকাঠি পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণকাজ, প্রকল্পের বরাদ্দ গোপন, অসমাপ্ত কাজের বিল পরিশোধ এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। খাল পুনঃখনন, সড়ক সংস্কার, ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন গোরস্থান নির্মাণসহ প্রায় ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টরা।

 

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কার্যাদেশ পেতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দাবি করা হতো। কমিশন না দিলে কার্যাদেশ দেওয়া হতো না বলেও একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন। পাশাপাশি মানবিক সহায়তা ও দান-অনুদানের নামে বরাদ্দের অর্থের একটি অংশ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয় সুত্রের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, তা জনগণের কাছ থেকে আড়াল করতে অধিকাংশ প্রকল্পের নামফলক বা ভিত্তিফলকে বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই পর্যন্ত ঝালকাঠি পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (স্থানীয় সরকার) বর্তমানে জেলা প্রশাসক (সার্বিক)মোঃ কাওছার হোসেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঝালকাঠিতে কর্মরত থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ ও অনুগত একটি বলয় বা সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই প্রভাবশালী বলয়ের কারণে পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বণ্টন ও বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও ঠিকাদার সুবিধা পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 

এদিকে, সম্প্রতি মোঃ কাওছার হোসেনকে ঝালকাঠি পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন করে অন্য একজন প্রশাসককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন ওঠার পরই তাকে প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

 

এছাড়াও তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ঝালকাঠি পৌরসভার নির্বাচিত মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে পৌর এলাকার সাতটি খাল পুনঃখননের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। একই বছরের ২৮ আগস্ট তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফারাহ গুল নিঝুম প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন।

 

আরো অভিযোগ রয়েছে, সাতটি খালের মধ্যে ছয়টির খননকাজ শুরু হলেও তা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। অপর একটি খালের কাজ শুরুই হয়নি। ফলে খননকৃত খালগুলো বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে অনেক খাল এখন মশার প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যা ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

 

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের অর্ধেক কাজও সম্পন্ন না হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজমিরী বিল্ডার্সকে প্রায় ৭০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করেছে পৌর কর্তৃপক্ষ।

 

 

তবে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী টি. এম. রেজাউল হক রিজভী বলেন, “খাল খননের প্রায় ৫৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সে অনুযায়ী চলমান বিল পরিশোধ করা হয়েছে।”
২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার, ৮৫০ মিটার ড্রেন, ৫০০ মিটার ফুটপাত এবং ১১টি অবকাঠামো নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এসব প্রকল্পের বিপরীতে ইতোমধ্যে প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

 

 

এ ছাড়া এডিবি প্রকল্পের আওতায় জরুরি মেরামতের জন্য আরও ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮৭৫ মিটার পিচঢালাই সড়কের কার্পেটিং করা হয়েছে।

 

 

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব উন্নয়নকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে দায়সারাভাবে কাজ শেষ করা হয়েছে। অনেক বড় প্রকল্প জেলার বাইরের প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

 

 

পৌরবাসী মনির হোসেন বলেন, “খাল খননের নামে খালগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে। এখন সেগুলো মশার প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে।”
কলেজ রোডের বাসিন্দা হুমায়ুন কবীর বাদল বলেন, “ফায়ার সার্ভিস মোড় থেকে কলেজ মোড় পর্যন্ত নতুন কার্পেটিং করা সড়কের আস্তরণ কাজ শেষ হওয়ার পরই উঠে যেতে শুরু করেছে। জনগণের অর্থ ব্যয় হলেও উন্নয়নের সুফল মিলছে না।

 

 

ঝালকাঠি জেলা ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ হাওলাদার বলেন, “যেখানে ড্রেন নির্মাণের প্রয়োজন ছিল, সেখানে কাজ হয়নি। বরং অগ্রাধিকারবিহীন প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

 

জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মুবিনুল ইসলাম সাদ্দাম অভিযোগ করে বলেন, “একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো প্রকল্পের কাজ দেওয়া হয়নি।

 

 

স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম সুমন বলেন, “যে সড়ক কয়েক বছর আগে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায় সংস্কার হয়েছিল, সেটিই এবার ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার দেখানো হয়েছে। প্রকল্পের বরাদ্দ প্রকাশ করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়ে যাবে।

 

 

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, জেলা সুজনের সম্পাদক এবং টিআইবির সনাক সদস্য ইসমাঈল মুসাফির বলেন, “১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার খাল খনন প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই ৭০ লাখ টাকা বিল উত্তোলন কীভাবে সম্ভব হলো, সেটির জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামফলকে বরাদ্দের তথ্য উল্লেখ করা নীতিগতভাবে বাধ্যতামূলক। রাস্তা নির্মাণেও অনিয়মের অভিযোগ স্পষ্ট। বিষয়গুলো নিয়ে সুজন পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে এবং টিআইবির সনাক সভায় আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

 

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ঝালকাঠি পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী টি. এম. রেজাউল হক রিজভী বলেন, “খাল খননের প্রায় ৫৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সে অনুযায়ী চলমান বিল পরিশোধ করা হয়েছে। রাস্তার কার্পেটিং উঠে যাওয়ার ঘটনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজমিরী বিল্ডার্সকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যান্য প্রকল্পেও গুণগত মান নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোথাও ত্রুটি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও সাবেক পৌর প্রশাসক মোঃ কাওছার হোসেনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও তিনি কোন উত্তর না দেয়ার ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

সংবাদটি শেয়ার করুন ...




© All rights reserved DailyAjkerSundarban